
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে ঢাকার বিভিন্ন সংসদীয় আসনে ‘লাখে লাখে ভোটার যোগ-বিয়োগ’ নিয়ে নানা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এসব গুজবে দাবি করা হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট কিছু আসনে অস্বাভাবিক হারে ভোটার বাড়ানো বা কমানো হয়েছে, যা নাকি একটি বৃহৎ ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য যাচাই করলে দেখা যায়, এসব দাবির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
নির্বাচন কমিশনের বরাতে গতকাল প্রকাশিত সমকাল পত্রিকার খবরে বলা হয়, সারাদেশে মোট ৭ লাখ ৭১ হাজার ভোটার এক আসন থেকে অন্য আসনে স্থানান্তরিত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি আসনে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৫৭০ জন ভোটার স্থানান্তর হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।
এদিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, ঢাকার ২০টি সংসদীয় আসন মিলিয়ে মোট ৪৯ হাজার ৯৯২ জন ভোটার স্থানান্তর হয়েছে। গড়ে প্রতিটি আসনে আড়াই হাজারের মতো ভোটার স্থানান্তর হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সবচেয়ে বেশি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে ঢাকা-২ ও ঢাকা-৭ আসনকে কেন্দ্র করে। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-২ আসনে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ভোটার কমেছে, আর ঢাকা-৭ আসনে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ভোটার বেড়েছে। এই দুই সংখ্যাকে সামনে রেখেই ‘কারসাজির’ অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
কিন্তু প্রকৃত কারণ হলো আসন সীমানা পুনর্নির্ধারণ। আগে ঢাকা-২ আসনের অন্তর্ভুক্ত দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড (কামরাঙ্গীরচর) এবার ঢাকা-৭ আসনে যুক্ত হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এক আসনে ভোটার কমেছে এবং অন্য আসনে প্রায় সমান সংখ্যায় বেড়েছে।
প্রথম আলো-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে এবারে ঢাকা-২, ৪, ৫, ৭, ১০ ও ১৪—এই ছয়টি আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়েছে।
ঢাকা-৪ আসনে ভোটার বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার। কারণ, ঢাকা-৫ আসনের দুটি ওয়ার্ড এখানে যুক্ত হয়েছে।
ফলে ঢাকা-৫ আসনে ভোটার কমেছে প্রায় ৭০ হাজার।
আবার ঢাকা-১০ আসনে প্রায় ৬৪ হাজার ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ ঢাকা-৭ আসন থেকে দুটি ওয়ার্ড কেটে এখানে যুক্ত করা হয়েছে।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে কেন ঢাকা-২ ও ঢাকা-৭ আসনে ভোটার হ্রাস-বৃদ্ধি প্রায় সমান নয়? এর ব্যাখ্যাও রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় আসন ঢাকা-১৯ (সাভার) থেকে একটি এলাকা ঢাকা-২ আসনে যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সাভার থেকে বনগাঁও ইউনিয়ন যুক্ত হয়েছে ঢাকা-১৪ আসনে, ফলে ঢাকা-১৪ আসনে প্রায় ৩৮ হাজার ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত আরেকটি আসন হলো ঢাকা-১৫। এখানে ৫০ হাজার ভোটার যোগ হয়েছে—এমন দাবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তব তথ্য বলছে ভিন্ন কথা।
২০১৮ সালে ঢাকা-১৫ আসনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার
২০২৪ সালের নির্বাচনে ছিল ৩ লাখ ৪৪ হাজার
সর্বশেষ হালনাগাদে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫১ হাজারে
অর্থাৎ ভোটার সংখ্যা মোটামুটি স্থিতিশীল। এ সময় কিছু ভোটার মৃত্যুজনিত কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, আবার নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন। অন্য এলাকা থেকে এসে এই আসনে ভোটার হয়েছেন ৩ হাজার ৫২০ জন, যা মোট ভোটারের মাত্র ১ শতাংশ। ঢাকা শহরের মতো একটি মহানগরে বাসা ও এলাকা পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের স্থানান্তর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ২০টি আসনে মোট ভোটার ছিল ৮১ লাখ ৭০ হাজার ৫১৯ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তা বেড়ে হয়েছে ৮৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৫ জন। অর্থাৎ এই সময়ে ঢাকায় ভোটার বেড়েছে ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৬৬ জন।
গড়ে প্রতি আসনে প্রায় ১৫ হাজার ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে গড়ে বছরে প্রায় ২ শতাংশ হারে ভোটার বৃদ্ধি পায়। দুই বছরে প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি প্রত্যাশিত। ঢাকায় ভোটার বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪.১৬ শতাংশ, যা পরিসংখ্যানগতভাবে স্বাভাবিক।
বাংলাদেশে ভোটার নিবন্ধন এখন বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে হয়—আঙুলের ছাপ, চোখের ছাপ এবং স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে। ফলে একই ব্যক্তি একাধিক জায়গায় ভোটার হওয়া অত্যন্ত কঠিন। ব্যতিক্রম হিসেবে কিছু ক্ষমতাবান ব্যক্তি অতীতে একাধিক এনআইডি পেয়েছেন—এমন উদাহরণ থাকলেও তা সংখ্যায় নগণ্য।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিপুলসংখ্যক ভূতুড়ে বা দ্বৈত ভোটার ধরা পড়ার খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। তবে সেই বাস্তবতা বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনীয় নয়। বায়োমেট্রিক ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে এ ধরনের অনিয়ম কার্যত অসম্ভব।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে কয়েকটি আসনে হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হলেও পরবর্তী সময়ে এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। বর্তমানে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও অধিকাংশ আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান থাকে ১৫–২০ হাজার ভোট।
সে প্রেক্ষাপটে প্রতি আসনে গড়ে আড়াই হাজার ভোটার স্থানান্তর নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার মতো কোনো বিষয় নয়। এটি প্রতিটি নির্বাচনেই ঘটে আসছে।
অতএব, যাচাইহীন তথ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিভ্রান্ত না হয়ে বাস্তব তথ্যের ওপর আস্থা রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।