লবণাক্ততাপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে ধান উৎপাদন বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত নতুন জাত ‘ব্রি ধান১১৯’। রোপা আমন মৌসুমের উপযোগী এ জাতটি লবণাক্ত ও সাধারণ—উভয় ধরনের জমিতে চাষ করা যাবে। মাত্র ১১৫ দিনে পরিপক্ব হওয়া জাতটির ফলন জমির লবণাক্ততার মাত্রাভেদে হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৮ থেকে ৭ দশমিক ৬ টন।
গত ২৮ অক্টোবর জাতীয় বীজ বোর্ডের (এনএসবি) ১১৬তম সভায় আমন মৌসুমে চাষের জন্য জাতটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি বোরো মৌসুমেও চাষের উপযোগিতা যাচাই শেষে জাতীয় কারিগরি কমিটির সুপারিশ পাওয়া গেছে। তবে বোরো মৌসুমে চাষের জন্য জাতীয় বীজ বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো বাকি।
আধুনিক প্রজনন কৌশলে সাড়ে সাত বছরে উদ্ভাবন
ব্রি ধান১১৯ উদ্ভাবনে টার্গেটেড ক্রসিং ডিজাইন, মডিফায়েড ফিল্ড আরজিএ, ট্রেইট প্যানেল এসএনপি শনাক্তকরণ এবং হটস্পটভিত্তিক স্ট্র্যাটেজিক ফরোয়ার্ড ব্রিডিংয়ের মতো আধুনিক প্রজনন কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষকদের দাবি, এসব কৌশলের সমন্বয়ে মাত্র সাড়ে সাত বছরে জাতটি উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির তুলনায় এতে প্রায় চার বছর কম সময় লেগেছে।
ব্রি ধান৭৩-এর চেয়ে ফলন বেশি
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ব্রি ধান১১৯-এর ফলন ব্রি ধান৭৩-এর তুলনায় হেক্টরপ্রতি প্রায় এক টন বেশি। জাতটির গাছের গড় উচ্চতা ১১৩ সেন্টিমিটার। মজবুত কাণ্ডের কারণে গাছ ঢলে পড়ার প্রবণতাও তুলনামূলক কম।
প্রতি শীষে গড়ে ২১৫টি পুষ্ট দানা পাওয়া যায়, যা ব্রি ধান৭৩-এর তুলনায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি বেশি। শীষে দানার সংখ্যা বৃদ্ধিতে Gn1a জিন ভূমিকা রাখে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতটির চাল সরু ও আকর্ষণীয়। প্রতি এক হাজার দানার ওজন ১৬ দশমিক ৮ গ্রাম। দানার দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৯ মিলিমিটার, প্রস্থ ১ দশমিক ৮ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য-প্রস্থের অনুপাত ৩ দশমিক ২। চালের অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ। গবেষকদের মতে, চালের বৈশিষ্ট্য দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের ভোক্তাদের পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বোরো মৌসুমেও চাষের সম্ভাবনা
বোরো মৌসুমে জাতটির উপযোগিতা যাচাইয়ে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ২০টি এলাকায় লবণাক্ত ও অলবণাক্ত জমিতে মাঠপর্যায়ের ফলন পরীক্ষা (পিভিটি) করা হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে জাতীয় কারিগরি কমিটির সুপারিশ পাওয়া গেছে।
জাতীয় বীজ বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে একই জাতের বীজ দিয়ে আমন ও বোরো—দুই মৌসুমেই চাষ করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকের বীজ ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন পরিকল্পনা সহজ হতে পারে।
উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা
শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ পরিস্থিতিতে ব্রি ধান১১৯-এর স্বল্প জীবনকাল, তুলনামূলক বেশি ফলন, মজবুত কাণ্ড ও শীষে বেশি দানার বৈশিষ্ট্য উপকূলীয় কৃষিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে জাতটির প্রকৃত ফলন নির্ভর করবে জমির লবণাক্ততা, মাটির উর্বরতা, পানির প্রাপ্যতা ও ব্যবস্থাপনা, আবহাওয়া এবং চাষপদ্ধতির ওপর। কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে মানসম্মত বীজ সরবরাহ, অঞ্চলভিত্তিক চাষাবাদ নির্দেশনা এবং মাঠপর্যায়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নও প্রয়োজন।
জাতটির উদ্ভাবনে সহযোগী গবেষক হিসেবে যুক্ত এক গবেষক জানান, দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং গবেষণাযাত্রার অংশ হতে পারা তাঁর জন্য আনন্দের। বছরের পর বছর শ্রম, ধৈর্য ও নিরলস গবেষণার ফলেই নতুন জাতটি উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে।
Editor & Publisher: Ziaul Hoq Mizan
Address : 3/2 Outer Circular Road (4th Floor), Rajarbag, Dhaka, Bangladesh
© All rights reserved by Daily Morning Herald - 2024-25